সমালোচনা এড়িয়ে চলার সহজ কৌশল

শেয়ার করুন

মানুষ হিসেবে আমরা কোন না কোন সামাজিক গোত্র বা পরিবেশে জীবনযাপন করি। মিশতে হয় নানা মানসিকতার এবং নানা মতের মানুষের সাথে। আর যেখানে যত বেশি মানুষ, সেখানে ততবেশি মতামতের সমাগম ঘটে। সমালোচনা করা আমাদের এমন একটি নিয়মিত অভ্যাস যা থেকে বেঁচে থাকতে পারেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা সমাজে খুবই কম। মজার ব্যাপার যে, এই আমাদের একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না যিনি নিজের সমালোচনা শুনতে আগ্রহী। তবে জীবনে চলার পথে পারিবারিক, কর্মজীবন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষকে কমবেশি সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। কাজ বা ব্যবহারের সমালোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তা মেনেই এগিয়ে চলতে হবে। এ নিয়ে সমালোচকের সঙ্গে অহেতুক তর্ক-বিতর্কে বা ঝগড়ায় না গিয়ে বরং তা গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। তাহলেই জীবনে এগিয়ে গিয়ে সফল হওয়া সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু আমাদের বিশ্বাস করা উচিত যে কোন কাজের বিপরীতে ভালো খারাপ এই দুই ধরণের সমালোচনা আসতে পারে। কিন্তু আমরা যদি কারও সমালোচনাতে রেগে যাই বা ভয় পাই তাহলে সফলতা অর্জন করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। যারা সমালোচনা কে ভয় করে চলেন, তারা যে কোন কাজে নামার আগে অনেক দ্বিধাদন্দে ভোগেন এবং কিছু কিছু সময় সমালোচনার ভয়ে অনেকে কাজে হাতই দেয় না। আমরা যদি শুরু করতেই ভয় পাই, তাহলে সফলতা আসবে কিভাবে? আমরা যদি সমালোচনা কে সহ্য করে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি তাহলে বিজয় আসবেই। আর যদি কোন কারনে না আসে, তহলে মনে সন্তুষ্টি আসবে যে, আমি চেষ্টা করেছি, হয়তো পারিপার্শ্বিক কোন কারনে জিত হয় নি। তাই সফলতা লাভের জন্য আগে সমালোচনা শোনার বা সহ্য করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে এবং সমালোচনা থেকে কিছু শিক্ষা নেয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে।

জীবনে চলার পথে আমাদের দ্বারা অহরহ ভুল কাজ হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষেরা কখনো একই ভুল কাজ বার বার করেনা। বরং তারা ভুল কাজ থেকে শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করে। তাই ভুল করে সেই ভুলের মাসুল আঁকড়ে বেঁচে না থেকে ভুল থেকে শিক্ষা লাভ করা বুদ্ধিমানের কাজ। আর যদি কেউ ভুল না দেখিয়ে বসে থাকে আমার ভুলের অপেক্ষায় এবং তার পরে আমার ভুলের সমালোচনা করে তাহলে বুঝবো সে আমার কুৎসা রটাচ্ছে। অবশ্য সবাই নিজের সমালোচনা শুনতে অভ্যস্ত নাও হতে পারে। যে নিজের সমালোচনা শুনতে অভ্যস্ত নয়- আসলে তার নিজের প্রতি ভরসা কম। আমাকে দ্বারা হবে না, আমি পারবো না এই ধরণের চিন্তা যদি আমরা করি, আমি নিজে আগে থেকেই নিজেকে দুর্বল করে ফেলছি। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকলে অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। যারা নিজের প্রতি ভরসা রাখতে পারেন না তাদের জন্য জীবনে সফল হওয়া অনেক কষ্টকর।কাজ করলে তার সমালোচনা থাকবেই। তবু সমালোচনা ইতিবাচকভাবে নিতে পারা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কার্যক্ষেত্রে, কখনো বা ভালবাসার সম্পর্কে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় আমাদের। তবে সমালোচনা কীভাবে সামলে উঠবেন তা জানাও জরুরি।

 

 

নিচের ৯টি ধাপ সঠিকভাবে রপ্ত করতে পারলে আপনি সমালোচনা এড়িয়ে এবং সমালোচনাকে কাজে লাগিয়ে জীবনে সাফল্য লাভ করতে পারবেন।

১। এড়িয়ে চলুন

সমালোচক থাকবে এবং সমালোচনাও করবে এটা একটা স্বাভাবিক দিকে পরিণত হয়ে গেছে। আপনি ভালো কাজ করলেও আপনাকে সমালোচনার তীর্যক তীরের আঘাত সহ্য করতে হবে। সমালোচনার হাত থেকে আমাদের নিস্তার নেই। হ্যা এটা ঠিক যে, যখন কেউ আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করে তখন সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে বুদ্ধিমান হিসেবে আপনার করনীয় হবে যার তার সমালোচনা গায়ে না মেখে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া। কেননা কেউ আপনাকে কিছু বললো বা কোন কিছুতে আপনার উপস্থিতির কথা ব্যাখা করল, এর মানে এই নয় যে আপনি সত্যিকার অর্থেই সে সব বিষয়ের সাথে যুক্ত হয়ে গেলেন। তাই যার তার সমালোচনা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

 

২। নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করুন

নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করলে সমালোচনার অাঁচ আপনার গায়ে লাগবে না। এবং সমালোচকগন আপনার ক্ষতিসাধন করতে ব্যাহত হবে। কেননা আপনি যখন নিজে জানেন আপনি কি বা কে, তখন অবশ্যই অন্যের বলা কোন শব্দ বা বাক্য আপনাকে বিমর্ষ বা দুঃখিত করতে পারবে না। যার ফলশ্রুতি সমালোচনা আপনাকে পীড়া দিতে পারবে না। অন্যদিকে আপনি যদি নিজের উপর নিজেই বিশ্বাস স্থাপন না করতে পারেন তাহলে আপনি নিজেই সমালোচকদের সুবর্ণ সুযোগ তৈরী করে দিলেন। তখন তাদের সমালোচনার তোপের মুখে আপনাকে পরতেই হবে। তাই নিজের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন তাহলে সমালোচকরাও আপনার কাছে ঘেষতে পারবে না।

 

আরো পড়ুনঃ কঠিন পরিস্থিতিতে আপনার সুখ কে কিভাবে আবিষ্কার করবেন

 

৩। দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করুন

সমালোচিত হওয়া কোনো সহজ বিষয় নয়। বহু মানুষই সমালোচনার মাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করে। আর এ বিষয়টি আপনার মনমতো হতে পারে নাও হতে পারে। কিন্তু এটি তার দৃষ্টিভঙ্গি, এ বিষয়টি মনে রাখা উচিত। প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রই এখন বহুধরনের মানুষে পরিপূর্ণ। এখানে নানা মানুষ নানাধরনের বুদ্ধি নিয়ে আসবেই। আর এ ভিন্নধরনের বিষয়গুলো সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারলে তা ব্যবহার করে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাই সমালোচনাকে নেতিবাচক অর্থে নয় বরং ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে গ্রহণ করুন এবং তা থেকে আইডিয়া নিন। ভবিষ্যতে কিভাবে এ আইডিয়া কাজে লাগানো যায় সে বিষয়টি চিন্তা করুন।

 

৪। নিজের মনের আত্মতৃপ্তি অনুযায়ী কাজ করুন

অন্যের সমালোচনায় প্রভাবিত হয়ে যদি আপনি নিজের মনের বিরুদ্ধে কাজ করেন তাহলে সেই কাজ আপনাকে প্রশান্তি তো দেবেই না বরং আপনাকে ব্যর্থতার রাস্তায় প্রেরণ করবে। যেটা আপনার জীবনে বয়ে আনবে দুঃখ। তাই অন্যের সমালচনায় গায়ে না মাখানোর সহজ উপায় হলো নিজেকে বোঝানো যে আপনার পক্ষে একসঙ্গে সবাইকে খুশী করা সম্ভার নয়। আপনার কাজ বা ব্যাবহার দ্বার একই সময় কেউ আর কেউ অখুশি হবে এইটাই স্বাভাবিক। তাই সবার প্রাপ্য সম্মান বজায় রেখে নিজের মনের আত্মতৃপ্তি অনুযায়ী কাজ করুন তাতে আপনি যেমন সাফল্য লাভ করবেন তেমনি সমালোচনা আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

 

 

৫। শান্ত থাকুন

সমালোচনা শুনলেই অনেকের মাথা গরম হয়ে যায়। অনেকে আবার নিজেকে সামলাতেই পারেন না কোন কোন ক্ষেত্রে। আর এ কারণেই আময়াদের সমালোচনা থেকে কোনো ভালো বিষয় গ্রহণ করার ক্ষমতা হারাতে হয়। আর এ বিষয়টি খুবই ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা আপনার অই ব্যাক্তির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং আপনি ধীরে ধীরে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকবেন। কেনন না সমালোচনা কম বেশী সবাই করে। তাই নিজেকে শান্ত বা ঠান্ডা রাখুন। এক্ষেত্রে আপনার শিখে নেওয়া উচিত যে সমালোচনা শুনলেও কিভাবে নিজেকে শান্ত রাখা যায়। মাথা গরম স্বভাব যাদের তাদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি মোটেই সহজ কাজ নয়। কিন্তু চেষ্টা করলেই তা আয়ত্ব করা যায়। যে কোনো সমালোচনাকেই ঠাণ্ডা মাথায় গ্রহণ করা উচিত। এক্ষেত্রে সমালোচনার বিষয়টি যদি সঠিক না হয় তাহলে তা ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে বলা যেতে পারে। এছাড়া বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আপনার নিজ বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে।

 

৬। কিছু গ্রহণ করুন, কিছু ত্যাগ করুন

সমালোচনা আমাদের জীবনে আসবেই আর এই সত্য আমাদের মেনে নিয়েই জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই সমালোচনাকে নিজের কাজে কিভাবে লাগানো যায় সেইটা আমাদের খুজে বের করতে হবে। তাই সমালোচনা হলেই যে আপনার সম্পূর্ণ বিষয়টি গ্রহণ করতে হবে কিংবা সম্পূর্ণ বিষয়টি ত্যাগ করতে হবে, এমন নয়। সমালোচনাকে ভালোভাবে পর্যালোচনা করুন। এর যে অংশটি আপনার পক্ষে গ্রহণ করা লাভজনক এবং আপনাকে চলার পথে সাহায্য করবে সেইটা গ্রহণ করুন। এবং যে অংশ আপনার অপ্রয়োজনীয় মনে হবে তা ত্যাগ করুন। এভাবে সমালোচনা থেকে ভালো বিষয় গ্রহণ করতে পারবেন যেটা আপনাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

 

৭। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

সমালোচনা মানেই যে খারাপ সেইটা আমাদের ভিত্তিতে স্থাপিত হয়ে গেছে। আর এইটাই মূল সমস্যাটা সৃষ্টি করে। তাই আমাদের মনে আগেই বিরূপ ধারনাটা জন্ম নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু মনে রাখবেন নিন্দুক আপনার সবচেয়ে বড় উপকারী বন্ধু। তাই সমালোচনাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করতে হবে। আগেই বলেছি সমালোচনা বাজে বিষয় অনেকে প্রথমেই এমন ধারণা করেন। যদিও বিষয়টি মোটেই উচিৎ নয়। এক্ষেত্রে আপনার সহকর্মী, গ্রাহক কিংবা বস যেই সমালোচনা করেন না কেন তার সে সমালোচনার কারণ অনুসন্ধান করুন। এটি আপনার সমস্যাটির মাধ্যমে থেকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়তে সহায়তা করবে।

 

 

৮। নিজেকে শুধরে নিন

সমালোচকরা নিজের অজান্তেই আপনাকে সাহায্য করে। এই ব্যাপারটা ঘটনাটা বুঝতে পারলেই আপনাকে সমালোচনা তার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরতে পারবে না। কেননা তারা নিজেরাও জানেন না সমালোচনা করে তারা আপনাকে আপনার ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে কত বড় উপকার করছে। আর শেই ভুল গুলো যদি আপনি উপলব্ধি করে সুধরে নিতে পারেন তাহলেই ষোলকলা পূর্ন। সমালোচকদের দেখানো ভুলগুলো নিয়ে চিন্তা করুন। সেই ভুলগুলো শুধরে নেয়ার প্রশস্তি নিন। এতে করে আপনার দুর্বলতা আপনার শক্তিতে রুপান্তরিত হবে।

 

৯। নিজের প্রতি সৎ থাকুন

সৎ মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা শুধু এই ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের চলার পথে প্রত্যেকটি ধাপেই আমাদের সৎ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এই মহৎ গুন আপনাকে সকল ক্ষেত্রেই সাফল্যের চূড়ায় পৌছে দিতে ভূমিকা পালন করে। সততা আপনাকে আপনার কাজের অনুপ্রেরণা যোগায়। আর সৎ ব্যক্তি কখনোই খারাপ কাজে নিজেকে নিয়জিত রাখে না। তাই সমালোচকরা সমালোচনা করলেও তাদের ক্ষতি সাধন করতে পারে না কেননা তারা জানে তারা যেটা করছে সেটা অবশ্যই কোন খারাপ কাজ নয়। তাই তারা সমালোচনার কাদা গায়ে মাখে না। তাই নিজের প্রতি সৎ থাকুন, সততাকে সঙ্গি করে এগিয়ে যান। তাহলে সমালোচনার জাল আপনাকে আটকাতে পারবে না। বেলাশেষে বিজয়ে হাসি আপনার মুখেই ফুটবে।

উপরের ধাপগুলো আপনাকে সমালোচনা এড়াতে এবং সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে জীবনের চলার পথে সেগুলোকে কাজে লাগাতে সাহায্য করবে বলে আশা করি।


শেয়ার করুন

Leave a Comment