সুখী হওয়ার ১০ টি সহজ কৌশল

শেয়ার করুন

আনন্দই জীবনের চালিকা শক্তি৷ আর এই আনন্দ সুখের ভেলায় চড়েই আসে। এই স্বার্থরঞ্জিত পৃথীবিতে আমাদের প্রত্যেক কর্মকান্ডই শুধু আমাদের সুখটুকুর জন্য। সুখ পাওয়ার আশাতেই জীবনে চলার পথে মানুষ এত সংগ্রাম করে। দুঃখের জন্য কেউই পদক্ষেপ নেয় না। সবাই সুখনামক আনন্দের ধর্নার সুরের জন্যই এত সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

জীবনে কে না সুখী হতে চায় বলুন। আপনি, আমি, আমরা সবাই সুখ লাভের জন্যই আপ্রান চেষ্টা করে যাই। হাতরে বেড়াই সুখের ঠিকানা। মোট কথা আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেসব কাজকর্ম করে থাকি সব কিছুই সুখ প্রাপ্তির আশা নিয়েই করি। কেউ তো আর দুঃখকে আপনা আপনি জীবনে বয়ে আনতে চাইবে না, তাই না?

কিন্তু জীবনের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চলার পথে নানা কারনে দুঃখ আমাদের গ্রাস করে। আসলে সুখ এবং দুঃখ মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। তাই জীবনের এই মতাযাত্রায় সুখের পর দুঃখ আসবে এবং আবার দুঃখের পর সুখ আসবে এইটাই প্রকৃতিক জীবচক্র। কিন্তু এর পাশাপাশি আমরা নিজেদের অজান্তে নিজারাই নিজেদের সুখগুলোকে বিনষ্ট করে দিচ্ছি প্রতিনিয়ত।

কেননা দুঃখ জীবনে আসলে মানুষ সেই দুঃখের শোককে আঁকড়ে ধরেই আনন্দহীন জীবনযাপন করে। এর থেকে বেড়িয়ে এসে এই দুঃখকে পাশ কাটিয়ে সুখের করিডরে পৌঁছে জীবনকে উপভোগ করার মত মানুষের সংখ্যা আমাদের দেশে খুব কমই রয়েছে। আর এই দুঃখময় জীবন তাদের আত্মবিশ্বাসকে গুড়িয়ে দেয়। আর আত্মবিশ্বাসের খুটি নড়বড়ে হয়ে গেলে অনুপ্রেরণায় ঘাটতি দেখা দেবে এটাই স্বাভাবিক।

আর সাফল্যের এই দুটি ভিত্তিই যদি নড়বড়ে হয়ে যায় তাহলে জীবনে সাফল্য আসবে আর সুখের দেখাও পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে আমরা যদি সুখী জীবনযাপন করি তাহলে আমাদের জীবন খুশিতে ভরে যায়। আনন্দময় হয়ে ওঠে আমাদের জীবনের পথচলা। তখন অনুপ্রেরণা থাকে আকাশচুম্বী এবং আত্মবিশ্বাস থাকে তুঙ্গে।

তাছাড়া সুখী মানুষরা বেশিদিন বাঁচেন৷ আশাবাদ ও ইতিবাচক চিন্তা হৃদরোগ ঠেকিয়ে রাখে, আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়৷ তাই জীবনে সুখী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা অত্যন্ত জরুরী।

নিচের ১০ টি কৌশল সঠিকভাবে অবলম্বন করলে আপনিও হতে পারেন সুখ নামক আনন্দ রাজ্যের রাজা।

 

১। নিঃসঙ্গ থাকবেন না, সঙ্গী খুঁজুন

একাকীত্ব আপনার জীবন থেকে সুখ নামক আনন্দ কেড়ে নেবে। একাকীত্বের বীজ প্রথমে তার শিকড় না ছড়ালেও ধীরে ধীরে তার শক্তি বিস্তার করে। তার চাদরে মুড়িয়ে নেয়। এর পরেই দেখা দেয় নানান সমস্যা। তাই নিঃসঙ্গ থাকবেন না, একাকীত্বের বীজ জীবনে রোপণ করার মত ভুল কররেন না। সম্পর্কগুলোকে আঁকড়ে ধরে জীবনযাপন করুন।

কেননা সম্পর্ক মানুষকে সুখী থাকতে সাহায্য করে৷ যাঁরা সমাজে নানা রকম মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রেখে চলেন, তাঁরা অন্যদের তুলনায় আরও সুখী ও সুস্থ থাকেন এবং আরও বেশিদিন বাঁচেন৷

বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক জীবনে ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার অর্থ নিয়ে আসে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়৷ নিজের সম্পর্কগুলি আরও মজবুত করে তুলুন, নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলুন৷ সুখী হওয়ার জন্য এটা অত্যন্ত জরুরি৷

 

২। অন্যদের জন্য কিছু করুন

অন্যদের সাহায্য করা নিজেদের সুখের চাবিকাঠি – এটা আমাদের আরও আনন্দ দেয়, আরও স্বাস্থ্যবান করে তোলে৷ কেননা অন্যদেরকে সাহায্য করলে আমাদের মন অচিরেই খুশী হয়ে যায়। নিজের জন্য করলে যতটা না খুশি লাগে অন্যের জন্য করতে পারলে ভিতরে নিজের জন্য গর্ব জন্মায় আর এটাই নিজেকে বাহবা দিয়ে আমাদের আনন্দ প্রদান করে।

বিশ্বাস করছেন? আচ্ছা নিজের টাকা দিয়ে নিজের মায়ের জন্য একটি শাড়ী বা বাবার জন্য একটি পাঞ্জাবি বা যেকোনো একটা উপহার তাদের দিন দেখবেন আপনার মন আনন্দে ভরে গেছে। এবং এই আনন্দ আপনার চোখের কোনায় দু-ফোটা সুখের জলও বয়ে আনতে পারে।

তাছাড়া অন্যের জন্য কিছু করলে মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ভীত আরও মজবুত হয়৷ ফলে সার্বিকভাবে সমাজের উপকার হয়, সবাই সুখী হয়৷ সব ক্ষেত্রে প্রশ্নটা টাকা-পয়সার নয়৷ সময়, আইডিয়া, শ্রম দিয়েও সাহায্য করা যায়৷ অতএব মন ভালো করতে ভালো কিছু করুন৷ তাহলে দেখবেন ভেতরে মনের অজান্তেই সুখ অনুভব করছেন।

 

আরো পড়ুনঃ একাকীত্ব দূর করার উপায় – উপভোগ করুন নতুন জীবন

 

৩। নিজের শরীরের যত্ন নিন

আমরা বেলা শেষে নিজেদের শরীরেই বসবাস করি। নিজের শরীর ভালো না থাকলে কোন কাজেই মন বসে না। শরীর ও মন একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত৷ শরীর সক্রিয় থাকলে মনও খুশি থাকে, স্বাস্থ্য ভালো থাকে৷

‘মুড’ ভালো থাকলে মানসিক অবসাদ থেকেও বেরিয়ে আসা যায়৷ তাছাড়া যে নিজের প্রতি যত্নবান নয় সে কখনো এগোতে পারে না কেননা যে নিজের যত্নই নিতে পারে না যে অন্যের বা কাজের ক্ষেত্রে কিভাবে যত্ন নেবে? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো নিজের সুখের জন্য নিজেকে নিজের যত্ন নিতে হবে। দেহ,মন ভালো থাকলে আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।

তাই নিজের যত্ন অবশ্যই নিতে হবে আর এর জন্য প্রতিদিনই কিছু সহজ কাজ করা যায়৷ যেমন ঘরের বাইরে গিয়ে তাজা বাতাস নেওয়া ও যথেষ্ট ঘুমানো৷

 

৪। পছন্দের লক্ষ্য স্থির করুন

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব মনের সুখের জন্য জরুরি৷ ‘মোটিভেশন’-এর জন্য সবারই কিছু লক্ষ্যের প্রয়োজন হয়৷ তবে সেগুলি অবাস্তব হলে চলবে না৷ তা না হলে অকারণ ‘স্ট্রেস’ বা মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে৷ উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবের কাঠামোর মধ্যে লক্ষ্য স্থির করলে জীবন সঠিক দিশায় চালিত হবে৷

সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে মনে পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি আসবে৷ অপরদিকে লক্ষ্য ছাড়া কাজে সাফল্য সম্ভব নয়। লক্ষ্য হলো সাফল্যের সিঁড়ি সরূপ। এবং লক্ষ্য মানুষকে সাফল্যের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যায়। আর সাফল্য লাভে কেইবা সুখ লাভ না করে বলুন? তাই পছন্দের লক্ষ্য স্থির করা জরুরী।

 

৫। আশেপাশের জগত সম্পর্কে অবগত হন

কখনো কি আপনার মনে হয়েছে যে, জীবন থেকে আরও কিছু পাওয়ার আছে? সুখবর হলো, সত্যি জীবনে আরও অনেক কিছু আছে৷ থমকে দাঁড়িয়ে আমাদের সেটা অনুধাবন করতে হবে৷ মনোযোগ বাড়ালে জীবনের সব ক্ষেত্রে ভালো লাগার অনুভূতি বাড়ে৷

বর্তমান কালে সজাগ থাকলে অতীত সম্পর্কে অনুতাপ হবে না, ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও সব সময়ে দুশ্চিন্তা থাকবে না৷ আর বর্তমান নিয়ে থাকলে আপনার জীবনকে উপভোগ করতে পারবেন কেননা মানুষের হতাশ হবার মূল কারনই অতীত নিয়ে পড়ে থাকা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা। এই দুইয়ে মিলে মানুষের সুখটুকু কেড়ে নেয়।

তাই বর্তমানকালে সজাগ থাকা জরুরী যাতে অতীতের ফেলা আসা কষ্ট এবং ভবিষ্যৎ এর দুশ্চিন্তা আপনাকে স্পর্শ না করতে পারে।

 

আরো পড়ুনঃ ১৫টি উপায় যা আপনাকে সম্মানিত করে তুলবে

 

৬। চাই ‘পজিটিভ’ চিন্তাধারা

আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির মতো ইতিবাচক আবেগ শুধু কিছু সময়ের জন্য ভালো নয়৷ বার বার এই সব অনুভূতি ফিরে আসলে জীবন সার্বিকভাবে আরও সুখকর হয়ে ওঠে৷ ইতিবাচক চিন্তাশক্তির ক্ষমতা অনেক। এটি মানুষের আত্মবিশ্বাসকে প্রখর করে তোলে। ফলে অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় শতভাগ।

আর জীবনে এই দুটি ভিত্তি ঠিক থাকলে বেলা শেষে সুখের হাসিটা আপনার মুখেই ফুটবে। জীবনে সুখ-দুঃখ আছে বটে, কিন্তু কোনো পরিস্থিতির ভালো দিকটির প্রতি মনোযোগ দিলে সত্যি উপকার হয়৷ পাত্রের অর্ধেকটা ভরা দেখলেই ভালো, অর্ধেকটা খালি নয়৷

 

৭। শিক্ষা বন্ধ করবেন না

শিক্ষা মানুষের মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেলে যেমন মানুষ আর দাঁড়াতে পারে না ঠিক তেমনি জীবন থেকে শিক্ষা চলে গেলে মানুষ আর জীবনে উন্নতি সাধন করতে পারে না। তার জীবনে সুখের হাওয়া আর বয়ে চলে না জীবন ভরে ওঠে দুঃখ নামক বিভীষিকায়।

ভালো থাকার ক্ষেত্রে শিক্ষার ইতিবাচক প্রভাব থাকে৷ মনে নতুন আইডিয়া আসে, আমাদের কৌতূহলী ও সক্রিয় থাকতে সাহায্য করে৷ শিক্ষা মনকে তৃপ্তি দেয়, আত্মবিশ্বাস ও ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে৷ নতুন কিছু শেখার অনেক সুযোগ রয়েছে – যেমন নতুন কোনো দক্ষতা, ভাষা, খেলা, গান ইত্যাদি৷

 

৮। নতুন করে জেগে উঠতে শিখুন

প্রত্যেকের জীবনেই ‘স্ট্রেস’, কিছু বা কাউকে হারানো অথবা অন্য কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা রয়েছে৷ আমরা কীভাবে তার মোকাবিলা করি, তার উপর আমাদের ভালো থাকা না-থাকা নির্ভর করে৷ আমাদের জীবনে কী ঘটবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা নিজেরা তা স্থির করতে পারি না৷

কিন্তু যা ঘটে গেছে, সে বিষয়ে আমরা আমাদের মনোভাব স্থির করতে পারি৷ একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী অনেক কিছুর মতো প্রতিরোধ ক্ষমতাও শেখা যায়৷

 

৯। নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন

কেউই নিখুঁত নয়৷ কিন্তু আমরা বার বার বাকিদের সঙ্গে নিজের তুলনা করি৷ নিজের যা নেই, তা নিয়েই যদি বেশি মাথা ঘামাই। আর এসব ভাবনাই আমাদের সুখিকে কেড়ে নেয় আমাদের কাছ থেকে। হতাশ হয়ে পরি এসব ভাবনায় বুদ হয়ে। আমরা যদি আমাদের নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকি তাহলে সুখী হওয়া কঠিন৷

তাই আমাদের যা আছে, তা নিয়েই বেশি ভাবা উচিত৷ বিশেষ করে কঠিন সময়ে আমরা যেমন, সেটা মেনে নিতে শিখলে এবং নিজের প্রতি আরো সদয় হলে জীবনে আনন্দ বাড়বে৷ অন্যদেরও তাদের মতো করে মেনে নিতে সুবিধা হবে৷

 

১০। নিজেকে বৃহত্তর জগতের অংশ হিসেবে দেখুন

যে মানুষ জীবনের অর্থ দেখতে পান, তিনি অনেক বেশি সুখী হন৷ তাঁর মানসিক চাপ, ভয় ও অবসাদের মাত্রাও কম হয়৷ ধর্মীয় বিশ্বাস, সন্তানের পিতা বা মাতা হওয়া – এমনকি নতুন চাকরিও জীবনে অর্থ বয়ে আনতে পারে৷ প্রত্যেকের জন্যই এই বোধ ভিন্ন হয়৷ কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই বোধ আসে, যে আমরা বৃহত্তর জগতের একটা অংশ মাত্র৷

পরিশেষে বলব, সুখ-দুঃখ মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। দুঃখ পেলেই ভেঙ্গে পরবেন না, হতাশ হয়ে পথ চলা থামিয়ে দেবেন না। এসব তুচ্ছ কারনে জীবনে থামিয়ে রাখার কোন মানেই হয় না। হয়ত রাত পোহালেই আপনার মুদ্রার পিঠটি ঘুরে যেতে পারে।


শেয়ার করুন

Leave a Comment