ইতিবাচক চিন্তা করার সহজ কৌশল

শেয়ার করুন

ইতিবাচক চিন্তার শক্তি বেশ প্রখর। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে দুইবার ঘটে; একবার চিন্তায় আর একবার বাস্তবে অর্থাৎ একবার ভেতরে অন্যবার বাইরে। মানুষ যা কিছু করে তার আগে সে চিন্তা করে। চিন্তা যেমন হবে কাজ তেমন হবে। একটি কাজ বার বার করলে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। অভ্যাসের সমষ্টি তার চরিত্র এবং চরিত্রই নিয়ে যাবে তার গন্তব্যে।

অর্থাৎ একজন মানুষের গন্তব্য সুখের জায়গায় নাকি দুঃখের জায়গায় হবে তা নির্ভর করবে তার চরিত্রের ওপর। চরিত্র নির্ভর করে অভ্যাসের ওপর আর অভ্যাস নির্ভর করে কর্মের ওপর। কর্ম নির্ভর করে চিন্তার ওপর। সুতরাং চিন্তা যেমন হবে বাকি সব ধাপ তেমনই হবে। সুতরাং জীবনকে সুখ শান্তিময় করতে আর্থাৎ সফল ও সার্থক জীবনের জন্য চিন্তাকে ইতিবাচক করতেই হবে।

প্রথমেই আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে ইতিবাচক চিন্তা বা Positive Thinking টা কী বুঝায়। ইতিবাচক চিন্তা মানে হলো “যে কোনো অবস্থায় সঠিক চিন্তা করতে পারা”। যে কোনো অবস্থায় বা যে কোনো পরিস্থিতিতে সঠিক চিন্তা করতে পারাকেই পজিটিভ থিংকিং বলে। সঠিক চিন্তা বেঠিক নয়। বেঠিক বা ভুল চিন্তা করলে তা ইতিবাচক হবে না।

এখন প্রশ্ন হলো সঠিক চিন্তা বলতে কী বুঝায়। সঠিক চিন্তা বলতে বুঝায় “যা কিছু ঘটেছে সেই ঘটনাকে ওইভাবেই দেখা এবং ভাবা”। অর্থাৎ যা ঘটেছে তা ঘটার মতো করে দেখা অর্থাৎ সোজাভাবে দেখা, বাঁকাভাবে নয়। বাঁকাভাবে দেখলে চিন্তা বাঁকা হয়ে যাবে।

বিষয়টি একদম সোজা যেমন আপনি কোনো কিছু সঠিক দেখতে পান তখনই যখন আলো সেই বস্তুর উপর সোজা হয়ে পড়বে এবং সোজাভাবে আপনার চোখের ভেতর প্রবেশ করবে তখনই তা আপনি দেখবেন। সুতরাং কোনো বিষয় বা ঘটনাকে সোজা ভাবে যদি আপনার কাছে উপস্থাপিত না হয় বা সোজাভাবে যদি না দেখেন বা না ভাবেন তবে সিদ্ধান্ত কখনই সঠিক হবে না। সুতরাং যা কিছু হয়েছে বা ঘটেছে তা সেইভাবে দেখতে পারা সঠিক চিন্তা করতে পারার পূর্বশর্ত।

ইতিবাচক চিন্তা আপনাকে এনে দিতে পারে সাফল্যের স্বাদ। কেননা ভাবনা ভালো হলে কাজ করার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসটা টইটুম্বুর থাকে। আর নিজের আত্মবিশ্বাস অটুট থাকলে আপনি যতই হোচট খান না কেন, ঠিক উঠে দাঁড়িয়ে পুনরায় সাফল্যের পথে হাটবেন। আর তখন সাফল্যের শীর্ষচূড়ায় আপনার অবস্থান কেউ আটকাতে পারবে না।

অন্যদিকে আপনি যদি কাজ করার আগেই নেতিবাচক চিন্তা করেন তাহলে আপনার আত্মবিশ্বাসের খুটি নড়বড়ে হয়ে যাবে এবং অনুপ্রেরণায় ঘাটতি দেখা যাবে। আর সাফল্যের এই দুটি মূল ভিত্তিই যদি নড়বড়ে হয়ে যায় তাহলে ব্যর্থতার তকমা কপালে লেপতে হবে এইটাই স্বাভাবিক। তাই আমাদের ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে জীবনের প্রত্যেক পদক্ষেপেই।

নিচের ৮ টি কৌশল সঠিকভাবে অবলম্বন করলে আপনিও ইতিবাচক চিন্তাশক্তির অধিকারী হতে পারবেন।

 

১। সময় নিন

জীবন নামক গোলকধাঁধায় আমাদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। জীবনে চলার পথে যেমন ভালো সময় আসে ঠিক তেমনি আসে খারাপ সময়ও। সব সময়ই সময় ভালো কাটবে এইটা ভাবা বোকামি। মুদ্রার যেমন এপিঠ ওপিঠ রয়েছে তেমনি সব কিছুরই ২টি দিক রয়েছে। তাই জীবনের এই দীর্ঘ চলার পথে খারাপ সময় আসবেই এইটাই স্বাভাবিক।

আর সেই খারাপ সময়কে অতিবাহিত করতে সময় নিন। আগেই নেতিবাচক চিন্তা করে ভুল সিদ্ধান্ত নেবেন না। অপেক্ষা করুন খারাপ সময়টি কাটার জন্য, নিজেকে সময় দিন। আর এটি আপনার ইতিবাচক চিন্তা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। এবং এটি আপনার আত্মা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। তাছাড়া সময় ক্ষত সারাতে সহয়তা করে এবং এটি আপনাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

 

২। ইতিবাচক মানুষের সাথে মিশুন

জীবনে উন্নতি করতে হলে ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী হতে হবে। আর নেতিবাচক মানুষের সাথে মেলামেশা করলে ইতিবাচক চিন্তা করা কখনোই সম্ভব নয়। কেননা খারাপ দিকটি মানুষকে বেশি প্রভাবিত করে। নিষিদ্ধ দিকে মানুষের বরাবরই আকর্ষণ বেশি। তাই আপনি নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলে আপনার চিন্তাশক্তির উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

এবং ধীরে ধীরে আপনার চিন্তাও নেতিবাচক দিকে রূপ নেবে এবং যেটা আপনার জীবনে ভয়ংকর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু আপনি যদি ইতিবাচক মানুষের সাথে মেলামেশা করেন তাহলে আপনার চিন্তাশক্তিও তাদের সংস্পর্শে পজেটিভ হবে। এবং তাদের কাছ থেকে অনেক শিক্ষা নিয়ে জীবনে চলার পথে কাজে লাগিয়ে উন্নতি সাধন করা সম্ভব। এই নিয়ে একটা বাংলা প্রবাদ বাক্য রয়েছে

“সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস
অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।”

আরো পড়ুনঃ সুখী হওয়ার ১০ টি সহজ কৌশল

 

৩। অন্যদের সাহায্য করুন

অন্যদের সাহায্য করা নিজেদের সুখের চাবিকাঠি – এটা আমাদের আরও আনন্দ দেয়, আরও স্বাস্থ্যবান করে তোলে৷ এবং আমাদের ইতিবাচক চিন্তাশক্তি আরো প্রখর করে তোলে। কেননা অন্যদেরকে সাহায্য করলে আমাদের মন অচিরেই খুশী হয়ে যায় আর মন খুশি থাকলে চিন্তাশক্তিও পজেটিভ হিয়।

নিজের জন্য করলে যতটা না খুশি লাগে অন্যের জন্য করতে পারলে ভিতরে নিজের জন্য গর্ব জন্মায় আর এটাই আমাদের ইতিবাচক চিন্তা করতে সাহায্য করে এবং সমভাবে আমাদের আনন্দও দিয়ে থাকে। বিশ্বাস করছেন না ? আচ্ছা নিজের টাকা দিয়ে নিজের মায়ের জন্য একটি শাড়ী বা বাবার জন্য একটি পাঞ্জাবি বা যেকোনো একটা উপহার তাদের দিন দেখবেন আপনার মন আনন্দে ভরে গেছে।

এবং এই আনন্দ আপনার চোখের কোনায় দু-ফোটা সুখের জলও বয়ে আনতে পারে। তাছাড়া অন্যের জন্য কিছু করলে মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ভীত আরও মজবুত হয়৷ ফলে সার্বিকভাবে সমাজের উপকার হয়, সবাই সুখী হয়৷

সব ক্ষেত্রে প্রশ্নটা টাকা-পয়সার নয়৷ সময়, আইডিয়া, শ্রম দিয়েও সাহায্য করা যায়৷ অতএব পজেটিভিটি অর্জন করতে এবং মন ভালো করতে ভালো কিছু করুন৷ তাহলে দেখবেন ভেতরে মনের অজান্তেই সুখ অনুভব করছেন।

 

৪। নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকুন

কেউই নিখুঁত নয়৷ কিন্তু আমরা বার বার বাকিদের সঙ্গে নিজের তুলনা করি৷ নিজের যা নেই, তা নিয়েই যদি বেশি মাথা ঘামাই। আর এসব ভাবনাই আমাদের চিন্তাশক্তিকে নেতিবাচক করে তোলে। হতাশ হয়ে পরি এসব ভাবনায় বুদ হয়ে। নিজেদের প্রাপ্তি নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করতে শুরু করি। তখনই আমাদের আত্মবিশ্বাসে ভাঙ্গন ধরে। বিরূপ প্রভাব পরে মনের উপর।

তখন বেচে থাকার আসল মজাটা চলে যায়। কিন্তু আমরা যদি আমাদের নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকি তাহলে সুখী হওয়া কঠিন এবং ইতিবাচক চিন্তা করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে৷ তাই আমাদের যা আছে, তা নিয়েই বেশি ভাবা উচিত৷ বিশেষ করে কঠিন সময়ে আমরা যেমন, সেটা মেনে নিতে শিখলে এবং নিজের প্রতি আরো সদয় হলে জীবনে আনন্দ বাড়বে৷ অন্যদেরও তাদের মতো করে মেনে নিতে সুবিধা হবে৷ তখন আমরা ইতিবাচক চিন্তা করতে সক্ষমতা লাভ করবো।

 

৫। ইতিবাচক উক্তি পড়ুন

ইতিবাচক চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করতে চাইলে ইতিবাচক উক্তি পড়ার বিকল্প আর কিছু নেই। মোটিভেশন ছাড়া জীবনে বেচে থাকা কঠিন। মোটিভেশন আমাদের প্রভাবিত করে, আর এটাকেই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে। ইতিবাচক উক্তি পড়লে সেই উক্তি গুলো আমাদের চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করবে।

আমাদের উদ্ভুদ্ধ করবে ইতিবাচক চিন্তা করতে। সঠিক রাস্তা দেখাবে যেই রাস্তা ধরেই সাফল্যের করিডরে পৌঁছানো সম্ভব। অন্যদিকে নেতিবাচক কিছু পড়লে সেটাও আমাদের প্রভাবিত করে, কিন্তু সেটা খারাপ দিকে। যেটা আপনার জীবনে বয়ে আনতে পারে ব্যর্থতা। তাজ ইতিবাচক উক্তি পড়া প্রয়োজন। আর শুধু পড়লেই হবে না, সেই অনুযায়ী আমল করলেই আপনার চিন্তাশক্তি ইতিবাচক হবে।

আরো পড়ুনঃ একাকীত্ব দূর করার উপায় – উপভোগ করুন নতুন জীবন

 

৬। নিজেকে ক্ষমা করতে শিখুন

ভুল করা অন্যায় নয় কিন্তু পুনরায় ভুল করা মহা অন্যায়। আমরা মানুষ আমাদের দ্বারা ভুল হবে এইটা স্বাভাবিক কিন্তু ভুলটাকে না সুধরে সেই ভুল পুনরায় করা অন্যায়। আর বেশিরভাগ মানুষ সেই কাজটাই করে প্রতিনিয়ত। জীবনের চলার পথে ভুলভ্রান্তি হয়েই যায় কিন্তু অনেকেই সেই ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপের মাধ্যমে সেই ভুলটাকেই আঁকড়ে ধরে বসে থাকে।

ভুলের জন্য নিজেকে দোষারোপ করার প্রক্রিয়া চলে প্রতিনিয়ত। আর এই কারনে আত্মবিশ্বাসে ব্যাপক ঘাটতি দেখা যায়। নতুন কোন কাজে হাত না দিয়ে নিজেকে দোষ দিয়ে বসে থাকে অনেকেই। যার ফলে তারা কখনই সাফল্যের শীর্ষচূড়ায় অবতারণ করতে পারে না।

কিন্তু এই ভুলকে পাশ কাটিয়ে নিজেকে যদি ক্ষমা করে, আপন উদ্যমে কাজে নেমে পড়লে তখন ফলাফলটা ভিন্ন হতো। সাফল্য তখন নিজ থেকেউ আপনার জালে ধরা দিত। তাই অতীতের করা ভুলের জন্য নজেকে দোষারোপ না করে নিজেকে ক্ষমা করার মধ্যমে নতুন করে কাজে নেমে পড়লে আমাদের জীবন সফলতায় ভরে উঠবে। আর এই প্রক্রিয়াই আমাদের ইতিবাচক চিন্তা করতে সহায়তা করবে

 

৭। ভুলের উৎস খুঁজে বের করুন

ইতিবাচক চিন্তার মানে এই নয় যে আপনি আপনার ভুল গুলো এড়িয়ে যাবে। ভুল গুলোকে প্রশ্রয় দেবেন। বরং এর মানে হলো আপনার ভুলগুলো বা নেতিবাচক দিকগুলোকে খুঁজে বের করে ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে সেই ভুলের সমাধান করে এগিয়ে চলা। কিন্তু আমরা যদি ভুলগুলোকে এড়িয়ে যাই তাহলে কোন ক্ষেত্রেই উন্নতি করা সম্ভব নয়।

কেননা ভবিষ্যৎ এ আমরা সেই ভুলগুলো পুনরায় করবো। কিন্তু ভুল করে ভুলের উৎস খুজে বের করে বুদ্ধিমত্তারর সাথে সেগুলোর সমাধান বের করলে পরবর্তীতে আমাদের দ্বারা সেই ভুলগুলো আর হবে না।

 

৮। ব্যর্থতাকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহন করুন

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে ” Failure is the pillar of success” আসলেই কিন্তু তাই, ব্যর্থতার থেকে শিক্ষা লাভ করে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছানো সম্ভব। আমরা যদি ব্যর্থ হয়ে পথচলা বন্ধ না করি, সেই ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে, সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাই আপন উদ্যমে তাহলে বিজয় নিশ্চিত।

তাই আমাদের প্রয়োজন ব্যর্থতাকে কাজে লাগানো। ব্যর্থ হওয়া মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া না এই কথাটা বুকেত বাপ পাশটায় চিরতরে স্থাপন করে রাখা। এই কথার বীজ বুকে রোপন করলে পরবর্তীতে এটাই গাছ হয়ে আপনাকে মিষ্টি ফল প্রদান করবে। তাই ব্যর্থ হলেই থেমে যাওয়া যাবে না। ব্যর্থতা হওয়ার ত্রুটিগুলোকে হাটিয়ে সেই ভুলগুলোকে শুধরে নিয়ে এগিয়ে চলতে হবে দুর্বার, তাহলে সাফল্যের হাসিটা আপনার মুখেই ফুটবে। তাই ব্যর্থতাও আপনাকে পৌছে দিতে পারে সাফল্যের শীর্ষচূড়ায়।

পরিশেষে বলব, ইতিবাচক চিন্তাই আমাদের সাফল্যের করিডোরে পৌঁছে দিতে পারে। নেতিবাচক চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে নেতিবাচক অনুভূতিগুলো যেন আমাদের নিয়িন্ত্রন না করতে পারে। আমরাই আমাদের নেতিবাচক অনুভূতিগুলোকে ইতিবাচক চিন্তাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করবো। তাহলেই জীবন সুন্দর হবে। আর আপনার সুন্দর জীবনই আমাদের একান্ত কামনা।


শেয়ার করুন

Leave a Comment